বিশ্বব্যাপী চাপিয়ে দেয়া মার্কিন শুল্কনীতির মূল বৈশিষ্ট্য আমদানির ভিত্তিতে শুল্কহারে বিভাজন ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা। প্রতিটি দেশের জন্য বাণিজ্য শর্ত আলাদা হওয়ার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোচনা হচ্ছে দ্বিপক্ষীয়ভাবে। একই পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনসভুক্ত (আসিয়ান) দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু আলোচনার গতি যেভাবে এগুচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে শুল্ক ছাড়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো জোটবদ্ধ ও দ্বিপক্ষীয়—কোনোভাবেই সুবিধা করতে পারছে না। খবর নিক্বেই এশিয়া।
আসিয়ানভুক্ত একাধিক দেশ মাসখানেক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যুক্ত রয়েছে। তারা এখনো স্থায়ী শুল্ক অব্যাহতির জন্য ফলপ্রসূ কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত উচ্চ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ৯০ দিনের জন্য স্থগিত রয়েছে, যা জুলাইয়ে শেষ হবে।
ম্যাক্রোইকোনমিক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা বিএমআইয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ঝুঁকি বিশ্লেষক ড্যারেন টে বলেন, ‘আসিয়ান এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তার সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেনি। আমরা নিশ্চিত যে বৈশ্বিক এ বাণিজ্য সংঘাতে কোনো বিজয়ী নেই।’
মালয়েশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান মালয়ান ব্যাংকিংয়ের বিশ্লেষক চুয়া হাক বিনের মতে, শুল্কারোপের ক্ষেত্রে ‘বিভাজন ও বিজয়’ কৌশল অবলম্বন করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিটি আসিয়ান দেশ ভিন্ন ভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের মুখোমুখি হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে দেশগুলোর ওপর মার্কিন অভিযোগও ভিন্ন ভিন্ন। এর ফলে সম্মিলিত আলোচনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত সোমবার কুয়ালালামপুরে আসিয়ান নেতাদের বৈঠকে জানান, শুল্কের প্রভাব কমাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবর চিঠি লিখে যুক্তরাষ্ট্র-আসিয়ান সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। সেখানে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া বিষয়ে আলোচনা হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলো আসিয়ানকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায় না। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ না বাড়িয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াকে কৌশল হিসেবে নিতে সম্মত হয়েছে দেশগুলো।
মালয়ান ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, আলোচনার অগ্রাধিকার তালিকায় ২০টি দেশকে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে আসিয়ানভুক্ত ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থাকলেও নেই থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন।
আসিয়ান অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ৪৯ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের হুমকিতে রয়েছে কম্বোডিয়া। সবচেয়ে কম সিঙ্গাপুরের ওপর ১০ শতাংশ। মালয়ান ব্যাংক জানিয়েছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
শুল্ক স্থগিতের ৯০ দিনের মধ্যে চুক্তিতে পৌঁছতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ভিয়েতনাম, না হলে তারা ৪৬ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়বে। গত সপ্তাহে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী গুয়েন হোং দিয়েনের নেতৃত্বে ওয়াশিংটনে গেছে ভিয়েতনামী প্রতিনিধি দল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ ও এক্সনমবিলের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার চেষ্টা করছে দেশটি। পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানি ওয়েস্টিংহাউজ ইলেকট্রিকের সঙ্গে যৌথভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়েও আলোচনা চালাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ সম্মেলনে সিলেক্ট ইউএসএতে অংশ নিয়েছে শতাধিক ভিয়েতনামি কোম্পানি। এছাড়া চীনা পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট ঠেকাতে কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে ভিয়েতনাম।
২৪ শতাংশ শুল্কের হুমকিতে থাকা মালয়েশিয়া শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসবে। এর আগে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপিইসি) সম্মেলনের মাঝে আলোচনায় বসেন দেশ দুটির প্রতিনিধিরা।
মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, শুল্কবহির্ভূত প্রতিবন্ধকতা দূর এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত মালয়েশিয়া। দেশটির বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী জাফরুল আজিজ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে। আলোচনা মালয়েশিয়ার জন্য ইতিবাচক হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছতে ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ৩২ শতাংশ শুল্ক হুমকিতে থাকা ইন্দোনেশিয়া। আরো বেশি এলপিজি, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, সয়াবিন ও গম আমদানির প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মন জয়ের চেষ্টা করছে দেশটি। গত মাসে ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া জানান, মার্কিন জ্বালানি আমদানি ১ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
বর্তমানে বেশির ভাগ জ্বালানি সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করে ইন্দোনেশিয়া। চলতি মাসের শুরুর দিকে বাহলিল লাহাদালিয়া জানান, তারা জ্বালানি আমদানির জন্য সিঙ্গাপুরের বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নেবেন।
৩৬ শতাংশ শুল্ক হুমকিতে থাকা থাইল্যান্ডও একই ধরনের সমঝোতার কৌশল গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। থাই রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানি পিটিটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি এলএনজি আমদানির কথা জানিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণ করতে না পারায় বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে থাই সরকার।
ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। যেখানে তারা ফিলিপাইনের পণ্যের ওপর ১৭ শতাংশ থেকে শূন্য শুল্কহার প্রাপ্তির লক্ষ্য তুলে ধরেন। দেশটির প্রেসিডেন্টের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফ্রেডেরিক গো বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে এমন কিছু ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে যা শুধু মার্কিন-ফিলিপাইন বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দৃঢ় করবে না। বরং ফিলিপাইনের রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণেও সহায়ক হবে।’
সবচেয়ে কম শুল্কহার পেয়ে থাকা সিঙ্গাপুরও মার্কিন বাজারে ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে ছাড় চাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশই শুল্ক থেকে অব্যাহতি আদায়ের নিশ্চিত কোনো আশ্বাস অর্জন করেনি।"